সপ্তাহে ৫০ টন তেঁতুল বেচাকেনা তিন পার্বত্য জেলায়।
তেঁতুল> নাম শুনেই জিভে জল? একসময় গাছতলায় পড়ে থাকা তেঁতুল এখন পাহাড়ের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
এককেজি-দুকেজি নয় সপ্তাহে ৫০ টন মেট্রিকটন তেঁতুল বেচাকেনা হয় তিন পার্বত্য জেলায় । ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, নরসিংদী ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে পাহাড়ের তেঁতুল। দেশের বিভিন্ন প্রন্ত থেকে থেকে আসা ব্যবসায়ীদের পদচারণা হাট-বাজারজুড়ে।
সম্প্রতি তিন পার্বত্য জেলায় কলা-কাঁঠালসহ কৃষিপণ্যের বলে খ্যাত ও বান্দরবান বাজার বিভিন্ন পর্যটক ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। স্থানীয় ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি দিন বাজারে ভোর থেকেই স্থানীয়রা তেঁতুল নিয়ে বাজারে আসেন।
দুপুরের মধ্যেই এসব তেঁতুল স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাত বদল করে চলে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, নরসিংদী ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের হাতে। তেঁতুল কিনে নেওয়ার পরে খোসাবিহীন ও খোসাসহ তেঁতুল আলাদা আলাদা কার্টুনে প্যাকেটিং করা হয় বাজারেই।
একসময় তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন হাট-বাজারে ৮০ -১০০ টাকা দরে প্রতি কেজি তেঁতুল বিক্রি হলেও সমতলের বিভিন্ন জেলায় তেঁতুলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এখন সেই টক-মিষ্টি তেঁতুল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে ১৭০ টাকায়। কোনো ধরনের কীটনাশক বা পরিচর্যা ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত তেঁতুল লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে তেঁতুল চাষে ঝুঁকছেন স্থানীয়রা।
বেশ ক’বছর ধরে বান্দরবান বাজার থেকে তেঁতুল নিয়ে যান ঢাকার ব্যবসায়ী মো. নুর নবী, হাসান আলী, সহ আরও ৫ জনের মতো - নরসিংদীর আবুল হোসেন ও চট্টগ্রামের জামাল উদ্দিন। তারা বলেন, দিন দিন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ আশেপাশের জেলায় খাগড়াছড়ির তেঁতুলের ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। তেঁতুলের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয় বাজারে দামও বেড়ে গেছে।
দেশের আচার তৈরির কারখানাগুলোতেও তিন পার্বত্য জেলার তেঁতুলের ব্যাপক চাহিদা আছে জানিয়ে নরসিংদী থেকে আসা পাইকার মো. আবুল হোসেন বলেন, নরসিংদীতে পাহাড়ি তেঁতুলের চাহিদা ব্যাপক। তেঁতুলে কোনো ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার করা হয় না। ফলে এর গুণগত মান ঠিক থাকে।
স্থানীয় বাজারে তেঁতুলের দাম ভালো পাওয়ায় খুশি গুইমারার হাফছড়ির হলাপ্রু মারমা বলেন, কোনো ধরনের বিনিয়োগ বা ঝুঁকি ছাড়াই তেঁতুল বিক্রি করে আমার পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে।
শুধু ১২ মাইল এলাকা -হলাপ্রু মারমা নয়, প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত তেঁতুল বিক্রি করে সংসারের অর্থনৈতিক চাকা ঘুরিয়েছেন গুইমারা বড়পিলাকের বাসিন্দা মো. আব্দুল হাই ও তবলছড়ির আব্দুর রহমানের মতো অনেকেই। তারা বলেন, তেঁতুলে লোকসান হয় না বলে তেঁতুলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
তারা বলেন, একসময় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে হতো বলে ভালো দাম পাওয়া যেত না। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ী আসার কারণে তেঁতুলের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বিক্রেতা সুনুইপ্রু মারমা বলেন, একসময় তেঁতুল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। এখন আর বসে থাকতে হয় না। বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যায়। ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি ক্রেতার জন্য অপেক্ষার দিনও শেষ হয়ে গেছে।
দেশব্যাপী তিন পার্বত্য জেলার তেঁতুলের বাজার তৈরি হওয়ার সাথে সাথে পাহাড়ে তেঁতুল দিয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও ব্যাপক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পাহাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আরও বেগবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাহাড়ে উৎপাদিত তেঁতুলের নির্দিষ্ট কোনো জাত নেই জানিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদরা বলেন, উচ্চ নিচু অজপাড়া গাঁয়ে নদীর পাড়ে অসংখ্য প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে তেঁতুল গাছ। সময়ের ব্যবধানে তেঁতুল বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন পাহাড়ের লোকজন।
তেঁতুল গাছ লাগানোর পর তেমন কোনো পরিশ্রম করতে হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, বড় তেঁতুল গাছ থেকে প্রতি বছর কয়েকশ মণ ফল পাওয়া যায়।
অসীম রায় (অশ্বিনী)
বান্দরবান
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন